কিছু কিছু মানুষের জন্মদিন আসে ক্যালেন্ডারের পাতায়। আর কিছু মানুষের জন্মদিন ফিরে আসে আমাদের স্মৃতির ভিতর দিয়ে। ১ সেপ্টেম্বর তেমনই একটি দিন।
বাংলা গানের অমূল্য রতন নচিকেতা চক্রবর্তীর জন্মদিন।
এই দিনটিকে শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন বললে বোধহয় তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ নচিকেতা শুধু গান করেননি—তিনি এক সময়কে কণ্ঠ দিয়েছেন। এক প্রজন্মের রাগ, অভিমান, প্রেম, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, নিঃসঙ্গতা আর বেঁচে থাকার জেদকে শব্দ দিয়েছেন। তাঁর গান শুনতে শুনতে বড় হয়ে ওঠা মানুষগুলির কাছে নচিকেতা কোনও দূরের তারকা নন; তিনি বরং সেই পুরনো বন্ধুর মতো, যার সঙ্গে বহু বছর দেখা না হলেও হঠাৎ কোনও সন্ধ্যায় তাঁর গলা শুনলেই মনে হয়—এই তো, মানুষটা এখনও ঠিক আগের মতোই আছে।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ।
বাংলা গানের আকাশটা তখন কেমন যেন ক্লান্ত। একদিকে পুরনো দিনের সুরের নস্টালজিয়া, অন্যদিকে নতুন সময়ের হাওয়ার টান। বাংলা আধুনিক গান যেন কোথাও দাঁড়িয়ে নতুন ভাষার অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষার মাঝেই একদিন ঝড়ের মতো এসে দাঁড়ালেন এক যুবক।
চেহারায় প্রচলিত নায়কোচিত চাকচিক্য নেই। রংবাহারী পোশাক, পায়ে স্নিকার, মুখে অগোছালো দাড়ি। হাতে গিটার। আর কণ্ঠে এমন এক স্বর, যার মধ্যে মিশে আছে শহরের ধুলো, মধ্যবিত্তের ক্লান্তি, প্রেমের দীর্ঘশ্বাস আর অদ্ভুত এক বিদ্রোহ।
তিনি নচিকেতা।
মঞ্চে উঠে তিনি শুধু গান গাইতেন না। গান থামিয়ে শ্রোতার সঙ্গে কথা বলতেন। আবার কথার মাঝেই গান ঢুকে যেত। কখনও হাসাতেন, কখনও অস্বস্তিতে ফেলতেন, কখনও এমন কোনও কথা বলে বসতেন, যা বাড়ি ফেরার পরও মাথার মধ্যে ঘুরত।
সেই সময় বাংলা গানের মঞ্চে যেন একটি ‘গান’-এর বদলে একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
আর মানুষটি খুব দ্রুত আপন হয়ে গিয়েছিলেন।
তারপর একদিন গান আর গান রইল না
নচিকেতার গান প্রথমবার শুনে হয়তো কেউ চমকে উঠেছিল। দ্বিতীয়বার শুনে মুগ্ধ হয়েছিল। আর তৃতীয়বারের পর বুঝেছিল—এই গান তো আসলে তার নিজের কথা!
এই ছিল নচিকেতার জাদু।
তিনি কোনও দূরদেশের প্রেমের গল্প বলেননি। তিনি আমাদের পাশের বাড়ির মানুষের গল্প বলেছেন। যে বাবা অবসরের পর সংসারে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন, যে ছেলে চাকরি না পেয়ে রাত জাগে, যে মেয়ে প্রেম হারিয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে, যে মানুষটি ভিড়ের শহরে থেকেও ভীষণ একা—নচিকেতা তাঁদেরই গল্প গেয়েছেন।
তাই তাঁর গান শুনতে শুনতে মনে হত, তিনি আমাদের চেনেন। খুব কাছ থেকে চেনেন।
‘নীলাঞ্জনা’ যখন বাজত, কোনও এক পুরনো প্রেমের মুখ মনে পড়ত। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শুনলে নিজের বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করত। আর যখন তাঁর কণ্ঠে উঠে আসত—
“ভিড় করে ইমারত আকাশটা ঢেকে দিয়ে,
চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদ…”
তখন মনে হত, এই তো আমাদের শহর!
এই তো আমাদের হারিয়ে যাওয়া বিকেল!
কংক্রিটের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে যে আকাশটুকু প্রতিদিন একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে, নচিকেতা সেই আকাশের জন্যও গান লিখেছেন।
নচিকেতা ছিলেন এক প্রজন্মের ডায়েরি
একটি প্রজন্মের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে অনেক কিছু লেখা থাকে। প্রথম প্রেম, প্রথম চিঠি, প্রথম প্রত্যাখ্যান, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, প্রথম চাকরি, বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়া, বাড়িতে অশান্তি, মধ্যরাতে একা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা।
নচিকেতার গান যেন সেই ডায়েরির পাতাগুলির পাশে লেখা ছিল।
ক্যাসেটের যুগ ছিল তখন।
একটি গান পছন্দ হলে বারবার রিওয়াইন্ড করতে হত। ফিতে কেঁপে কেঁপে গান ফিরত। কোনও কোনও ক্যাসেট এতবার বাজত যে তার শব্দেও যেন স্মৃতির গন্ধ লেগে যেত।
বন্ধুর বাড়িতে বসে নচিকেতার গান শোনা।
কলেজের ক্যান্টিনে তাঁর গান নিয়ে তর্ক।
রাতের অন্ধকারে হেডফোন কানে দিয়ে ‘নীলাঞ্জনা’ শোনা।
কারও প্রেম ভেঙে গেলে তাকে নচিকেতার গান শোনানো।
কেউ চাকরি না পেলে বেকারে যন্ত্রনায় মলম লাগাতে তার পাশে বসে 'সারে জাঁহা সে আচ্ছা' গুনগুন করা।
শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়া, সামাজিক অবক্ষয় ও চারপাশের অসঙ্গতি। গানটি শুরুই হয় বেকার যুবকের আত্মপরিচয় দিয়ে।
এসবই ছিল এক সময়ের জীবন।
আজকের প্রজন্ম হয়তো বুঝবে না, একটি গান তখন কীভাবে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠত। কোনও অ্যালগরিদম ছিল না, ‘রেকমেন্ডেড ফর ইউ’ ছিল না। ছিল শুধু বন্ধুর হাতে হাতে ঘুরে বেড়ানো ক্যাসেট, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গান আর মানুষের নিজস্ব পছন্দ।
সেইভাবেই নচিকেতা ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
‘জীবনমুখী’—শুধু একটি শব্দ নয়
নচিকেতার সঙ্গে ‘জীবনমুখী’ শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে দুটি শব্দকে আলাদা করা কঠিন।
কিন্তু তাঁর গানকে শুধু একটি ঘরানার মধ্যে আটকে রাখাও ভুল।
তিনি জীবনকে দেখেছেন বহু দিক থেকে।
কখনও তাঁর চোখে জীবন তীব্র ব্যঙ্গের। কখনও বিষণ্ণ। কখনও প্রেমময়। কখনও ক্ষুব্ধ। কখনও নিঃসঙ্গ। আবার কখনও আশাবাদী।
তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে—জীবন সুন্দর, কিন্তু সবসময় সুন্দর নয়।
ভালোবাসা আছে, কিন্তু সব প্রেম পূর্ণতা পায় না।
পরিবার আছে, কিন্তু পরিবারের মধ্যেও মানুষ একা হতে পারে।
শহর আছে, কিন্তু শহরের হাজার মানুষের ভিড়েও নিজের জন্য একটা জানালা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এই সত্যগুলিকে তিনি কোনও বক্তৃতার ভাষায় বলেননি। বলেছেন গানের ভাষায়।
আর তাই তাঁর কথা সরাসরি গিয়ে বসেছে মানুষের বুকের মধ্যে।
‘বৃদ্ধাশ্রম’—একটি গান, একটি আয়না
নচিকেতার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ যেন আলাদা করে দাঁড়িয়ে থাকে।
এটি কেবল বাবা-মাকে নিয়ে লেখা আবেগের গান নয়। এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না।
বয়স হয়ে যাওয়া মানুষটির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না—এই সহজ অথচ গভীর সত্যটি নচিকেতা গানের মাধ্যমে মনে করিয়ে দিয়েছেন।
গানটি শুনতে শুনতে কত মানুষ হয়তো নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কথা ভেবেছেন। কত মানুষ হয়তো ফোন তুলে বাড়িতে কথা বলেছেন। কত মানুষ হয়তো নিজের অজান্তেই চোখ মুছেছেন।
একজন শিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে?
যে গান শ্রোতার জীবনকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও বদলে দেয়, সেই গানই তো বেঁচে থাকে।
আর ‘নীলাঞ্জনা’—স্মৃতির নীল আলো
অন্যদিকে ‘নীলাঞ্জনা’ আমাদের নিয়ে যায় একেবারে অন্য জগতে।
প্রেমের গান বাংলা গানে নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু নচিকেতার প্রেমের ভাষা ছিল অন্যরকম। সেখানে প্রেমের সঙ্গে ছিল সময়, স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা।
‘নীলাঞ্জনা’ শুনলে শুধু একটি মেয়ের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে একটা সময়ের কথা।
মনে পড়ে সেই বয়স, যখন সন্ধ্যা নামলেই কারও জন্য অপেক্ষা করা যেত। ফোনের রিং বাজলে বুক কেঁপে উঠত। একটি চিঠি কয়েকদিন ধরে বালিশের নিচে রেখে দেওয়া যেত।
আজ সেই সময় নেই।
মানুষের হাতে স্মার্টফোন আছে, মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে যায়। কিন্তু অপেক্ষার সেই দীর্ঘ সৌন্দর্য কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
তাই নচিকেতার গান শুনলে শুধু গান শোনা হয় না—একটি হারিয়ে যাওয়া সময়কে ছুঁয়ে দেখা হয়।
আগুনপাখি কেন?
নচিকেতা থেকে ‘আগুনপাখি’ হয়ে ওঠার গল্প আসলে তাঁর শ্রোতাদের গল্পও।
তিনি আগুনের মতো এসেছিলেন। প্রচলিত গানের অনেক ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন। গানের বিষয়কে বদলেছিলেন। গায়ক-শ্রোতার দূরত্ব কমিয়েছিলেন।
তাঁর গান বলেছিল—গান শুধু সাজানো শব্দ নয়।
গান প্রশ্ন করতে পারে।
গান প্রতিবাদ করতে পারে।
গান হাসাতে পারে।
গান কাঁদাতে পারে।
গান নিজের ঘরের দরজা খুলে দিতে পারে।
আর গান কখনও কখনও আয়নার মতো সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে—
দেখো, এটাই তোমার জীবন।
এই কারণেই তিনি ‘আগুনপাখি’।
সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, গান বুড়িয়ে যায়নি
নচিকেতার জীবনে বহু বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলা গানের জগতেও এসেছে অসংখ্য পরিবর্তন। নতুন শিল্পী এসেছেন, নতুন সুর এসেছে, নতুন প্রযুক্তি এসেছে।
কিন্তু নচিকেতার গান এখনও শোনা হয়।
কারণ তাঁর গান কোনও নির্দিষ্ট দশকের সম্পত্তি নয়।
যে বাবা-মায়ের কথা তিনি গেয়েছিলেন, তাঁরা আজও আছেন।
যে প্রেমের কথা তিনি গেয়েছিলেন, সেই প্রেম আজও মানুষকে কাঁদায়।
যে একাকিত্বের কথা তিনি বলেছিলেন, তা আজ আরও গভীর।
যে শহরের কথা তিনি গেয়েছিলেন, সেই শহর আজ আরও কংক্রিটে ঢাকা।
আর যে মানুষটির কথা তিনি গেয়েছিলেন—সেই সাধারণ মানুষটি আজও ঠিক তেমনই বেঁচে আছে।
তাই তাঁর গান পুরনো হয় না।
বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু গান যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
আজ জন্মদিনে তাঁকে মনে পড়ছে অন্যভাবে
আজ যখন নচিকেতার জন্মদিন, তখন মনে হয়—আমরা কি তাঁকে শুধুই তাঁর জনপ্রিয় গান দিয়ে মনে রাখব?
না।
তাঁকে মনে রাখা উচিত সেই সাহসটির জন্য, যা বাংলা গানে একসময় প্রয়োজন ছিল।
তাঁকে মনে রাখা উচিত সেই ভাষার জন্য, যা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে গানের ভাষা করে তুলেছিল।
তাঁকে মনে রাখা উচিত সেই কণ্ঠের জন্য, যার মধ্যে কোনও কৃত্রিম মাধুর্য ছিল না—ছিল জীবনের খসখসে বাস্তবতা।
আর সবচেয়ে বেশি মনে রাখা উচিত সেই মানুষটিকে, যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—গান শুনে শুধু আনন্দ পেতে নেই, কখনও কখনও নিজের দিকে তাকাতেও হয়।
আজও হয়তো কোনও পুরনো ক্যাসেটের বাক্সে তাঁর গান পড়ে আছে।
কোনও পুরনো অ্যালবামের মলাটে সময়ের ধুলো জমেছে।
কোনও এক মধ্যবয়সী মানুষ অফিস থেকে ফিরে হঠাৎ ইউটিউবে নচিকেতার গান চালিয়ে দিয়েছেন।
গান শুরু হয়েছে।
আর মুহূর্তের মধ্যে তিরিশ বছর পেছনে চলে গেছেন তিনি।
সেই পুরনো ঘর।
সেই জানালা।
সেই বিকেল।
সেই অসমাপ্ত প্রেম।
সেই বন্ধুটি।
সেই বয়স।
সেই স্বপ্ন।
আর কোথাও খুব দূরে, কিংবা খুব কাছে, নচিকেতার কণ্ঠ ভেসে আসছে।
“ভিড় করে ইমারত আকাশটা ঢেকে দিয়ে,
চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদ…”
হয়তো সত্যিই আমাদের জীবনের অনেক ‘সোনারোদ’ হারিয়ে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—নচিকেতার গান সেই হারিয়ে যাওয়া রোদটুকু এখনও ফিরিয়ে দিতে পারে।
এই তো একজন সত্যিকারের শিল্পীর সাফল্য।
তিনি চলে যান না।
সময় তাঁকে সরিয়ে দিতে পারে না।
প্রজন্ম বদলে যায়, গান শোনার মাধ্যম বদলে যায়, শহরের চেহারা বদলে যায়—তবু তাঁর কোনও একটি গান হঠাৎ কোথাও বাজে, আর আমরা থমকে দাঁড়াই।
মনে হয়—
এই গানটা তো আমারই কথা।
এই অনুভূতিটুকুই নচিকেতার সবচেয়ে বড় অর্জন।
তাই আজ তাঁর জন্মদিনে শুধু শুভেচ্ছা নয়।
একটি প্রজন্মের হয়ে কৃতজ্ঞতা।
সেইসব বিকেলের জন্য, যেগুলিকে তিনি গানে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
সেইসব কান্নার জন্য, যেগুলির ভাষা তিনি দিয়েছেন।
সেইসব প্রেমের জন্য, যেগুলি পূর্ণতা পায়নি।
সেইসব বাবা-মায়ের জন্য, যাঁদের নিঃসঙ্গতার কথা তিনি আমাদের শুনিয়েছেন।
সেইসব মধ্যবিত্ত স্বপ্নের জন্য, যেগুলি ভেঙেও মানুষকে বাঁচতে হয়।
আর সেইসব মানুষের জন্য, যারা এখনও কোনও এক নির্জন রাতে নচিকেতার গান শুনে মনে মনে বলে—
“এ গানটা যেন আমারই জন্য লেখা…”
জন্মদিনে তাই প্রিয় নচিকেতা, আপনাকে প্রণাম।
বাংলা গানের আকাশে আপনার সেই আগুনপাখি আজও উড়ে বেড়াক।
আর আমাদের হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলির আকাশে—
একটু সোনারোদ হয়ে থাকুক আপনার গান।
আরও পড়ুনঃ বিদ্রোহের আগুন থেকে সাম্যের গান—নজরুলের যে জীবন আজও আমাদের বিস্মিত করে
- More Stories On :
- Nachiketa Chakraborty
- Singer
- Composer
- Lyricist
- Birthday

