লাল কার্ডেও থামল না কেনেরা! আজ়তেকায় মেক্সিকোর স্বপ্ন ভেঙে ইংল্যান্ড, হালান্ডের নরওয়ের সামনে টুখেলের দল
আজ়তেকা স্টেডিয়াম যেন আবার ইতিহাসের সাক্ষী। একসময় এই মাঠেই ডিয়েগো মারাদোনার হ্যান্ড অব গড ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন চূর্ণ করেছিল। চার দশক পরে সেই আজ়তেকাতেই আর এক ইতিহাস লিখল ইংল্যান্ড। প্রতিপক্ষ এবার মেক্সিকো। গ্যালারিতে প্রায় আশি হাজার দর্শকের গর্জন, পাহাড়ি উচ্চতার ক্লান্তি, ঘরের মাঠের অদম্য আত্মবিশ্বাস সব প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে ১০ জনে খেলেও ৩-২ গোলে আয়োজকদের হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল টমাস টুখেলের দল।এ যেন শুধুই একটি নকআউট ম্যাচ নয়। পাঁচ গোল, দুই পেনাল্টি, একটি লাল কার্ড, অসংখ্য স্নায়ুচাপের মুহূর্ত আর শেষ বাঁশি পর্যন্ত অনিশ্চয়তায় মোড়া এক মহারণ। ফুটবল কখনও কখনও নাটককেও হার মানায়। রবিবার রাতে আজ়তেকা তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে রইল।ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, ইংল্যান্ডকে সহজে শ্বাস নিতে দেবে না মেক্সিকো। প্রথম আধ ঘণ্টা কার্যত একতরফা আক্রমণ চালায় স্বাগতিকরা। রাউল হিমেনেজ়ের হেড, কিনোনেসের দৌড়, মাঝমাঠে নিরন্তর চাপ একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়ছিল ইংল্যান্ডের রক্ষণে। কিন্তু সেই ঢেউয়ের সামনে অটল প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন জর্ডন পিকফোর্ড। তাঁর গ্লাভসই বারবার বাঁচিয়ে দেয় ইংল্যান্ডকে।চাপ সহ্য করেও যে সুযোগের অপেক্ষা করতে হয়, সেই পাঠই যেন মুখস্থ করিয়ে রেখেছিলেন টমাস টুখেল। তিনি জানতেন, মেক্সিকোর সব নজর থাকবে হ্যারি কেনকে ঘিরে। তাই গোলের দায়িত্ব যেন নীরবে তুলে দিয়েছিলেন জুড বেলিংহ্যামের কাঁধে।৩৬ মিনিটে সেই পরিকল্পনারই নিখুঁত বাস্তবায়ন। নিজের বক্স থেকে শুরু হওয়া আক্রমণ কয়েক সেকেন্ডে পৌঁছে যায় প্রতিপক্ষের জালে। ডেকলান রাইসের দূরপাল্লার দৌড়, বুকায়ো সাকার নিখুঁত ক্রস, আর ডিফেন্ডারদের চোখ এড়িয়ে বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত হেড স্তব্ধ হয়ে যায় আজ়তেকা।কিন্তু সেটাই ছিল ঝড়ের শুরু।মাত্র ৯৮ সেকেন্ড পরে আবার ইংল্যান্ডের আঘাত। মাঝমাঠে অ্যান্থনি গর্ডনের বল কেড়ে নেওয়া, কেনের নিখুঁত পাস এবং বেলিংহ্যামের অনায়াস ফিনিশ। চোখের পলকে ২-০। হাজার হাজার মেক্সিকান সমর্থকের মুখে তখন নিস্তব্ধতা।তবু বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ এত সহজে শেষ হয় না। বিরতির আগে ফ্রি-কিক থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে জুলিয়ান কিনোনেস একটি গোল শোধ করতেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় মেক্সিকো। আবার জেগে ওঠে গ্যালারি। আবার চাপ বাড়তে থাকে ইংল্যান্ডের উপর।দ্বিতীয়ার্ধে নাটকের চূড়ান্ত বাঁক। ৫৪ মিনিটে VAR-এর সাহায্যে জ্যারেল কোয়ানসাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। প্রায় আধ ঘণ্টা একজন কম নিয়ে খেলতে হবে এই পরিস্থিতিতে অনেক দল ভেঙে পড়ে। ইংল্যান্ড ভাঙল না।বরং আরও সংগঠিত হয়ে উঠল।সাকাকে তুলে জন স্টোন্সকে নামালেন টুখেল। ডেকলান রাইস নেমে এলেন রক্ষণের গভীরে। প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি ক্লিয়ারেন্সে ফুটে উঠল শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাস।এরই মধ্যে আসে ম্যাচের আর এক মোড়। বক্সে অ্যান্থনি গর্ডনকে ফাউল করেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক। পেনাল্টি থেকে বরফশীতল স্নায়ুতে গোল করেন হ্যারি কেন। বিশ্বকাপে তাঁর ষষ্ঠ গোল। সোনার বুটের দৌড়ে তিনি আরও জোরালো দাবিদার।কিন্তু নাটক তখনও শেষ হয়নি।কিছুক্ষণ পর নিজের বক্সেই প্রতিপক্ষকে ফাউল করে বসেন সেই কেন। আবার VAR। আবার পেনাল্টি। এবার রাউল হিমেনেজ় গোল করে ব্যবধান কমান। শেষ কুড়ি মিনিটে আজ়তেকার প্রতিটি গর্জন যেন গোলের দাবি তুলছিল।মেক্সিকো মরিয়া হয়ে উঠেছিল। একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু পিকফোর্ড, স্টোন্স, রাইসদের সামনে বারবার থমকে যায় সেই প্রচেষ্টা। ১০ জনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত রক্ষণকে শিল্পে পরিণত করে।শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আজ়তেকার গর্জন থেমে যায়। উৎসব শুরু হয় ইংল্যান্ড শিবিরে।এই জয় শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার নয়। এটি মানসিক শক্তির জয়, কৌশলের জয়, শৃঙ্খলার জয়। প্রতিকূল পরিবেশ, লাল কার্ড, তীব্র দর্শকচাপ সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে দল লড়াই করতে পারে, বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত যাওয়ার স্বপ্ন দেখার অধিকার তারই থাকে।এবার সেই স্বপ্নের সামনে আরও বড় পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে যে দল কয়েক ঘণ্টা আগেই পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজ়িলকে বিদায় জানিয়েছে।আজ়তেকা পেরিয়েছে ইংল্যান্ড। সামনে অপেক্ষা আরও কঠিন যুদ্ধ। কেন বনাম হালান্ড বিশ্বকাপ এখন সেই মহারণের প্রতীক্ষায়।

