২৪ জুলাই এলেই বাঙালির মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা ফিরে আসে। এই দিনেই, ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই, বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ হারিয়েছিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ নক্ষত্র মহানায়ক উত্তম কুমারকে। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মহানায়কের জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমেনি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। তাই প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন অভিনেতাকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বাংলা সিনেমার এক স্বর্ণযুগকে স্মরণ করা।
কেন আজও উত্তম কুমার এত জনপ্রিয়?
উত্তম কুমার শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক আবেগ, এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, সংযম, মার্জিত রোম্যান্টিকতা এবং গভীর মানবিকতা। পর্দায় তিনি কখনও প্রেমিক, কখনও সংগ্রামী যুবক, কখনও পারিবারিক মানুষ, প্রতিটি চরিত্রকে এমনভাবে জীবন্ত করে তুলতেন যে দর্শক তাঁকে নিজের পরিবারের একজন বলে মনে করতেন।
মহানায়কের সংলাপ বলার ভঙ্গি, মিষ্টি হাসি, চোখের অভিব্যক্তি এবং অনবদ্য ব্যক্তিত্ব তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল। আজও টেলিভিশনে বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁর ছবি সম্প্রচার হলে নতুন দর্শকরাও মুগ্ধ হয়ে দেখেন।
বাঙালি কীভাবে তাঁকে স্মরণ করে?
প্রতি বছর ২৪ জুলাই তাঁর প্রয়াণ দিবসে—
* কেওড়তলা মহাশ্মশানে মহানায়কের আবক্ষমূর্তি ও স্মারকফলকরে উন্মোচন। উদ্বোধক মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
* কলকাতার টালিগঞ্জে তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করা হয়।
* চলচ্চিত্র জগতের শিল্পীরা তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান।
* আহিরীটোলায় মহানায়কের মূর্তিতে মাল্যদান।
* বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও স্মরণসভার আয়োজন করে।
* টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে সারাদিন তাঁর জনপ্রিয় সিনেমা ও বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়।
* অসংখ্য অনুরাগী সামাজিক মাধ্যমে তাঁর ছবি, সংলাপ ও স্মৃতিচারণ ভাগ করে নেন।
এভাবেই মহানায়ক আজও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত।
উত্তম কুমারের জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি: বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের সর্বকালের সেরা রোম্যান্টিক জুটিগুলির অন্যতম। তাঁদের রসায়ন আজও কিংবদন্তি।
'নায়ক' ছবিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এই ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয় এবং একজন তারকার অন্তর্জগতকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলে।
অসংখ্য সফল চলচ্চিত্র: প্রায় দুই শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন।
মহানায়ক উপাধি: দর্শকদের অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাঁকে "মহানায়ক" উপাধিতে ভূষিত করেছে, যা আজও অন্য কারও সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত নয়।
উত্তম কুমারের সেরা কিছু সিনেমা
১. হারানো সুর (১৯৫৭) – প্রেম, স্মৃতি ও আবেগের এক অনন্য সৃষ্টি।
২. সপ্তপদী (১৯৬১) – সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর কালজয়ী রোম্যান্টিক ছবি।
৩. সাগরিকা (১৯৫৬) – বাংলা রোম্যান্টিক সিনেমার অন্যতম মাইলফলক।
৪. নায়ক (১৯৬৬) – সত্যজিৎ রায় পরিচালিত আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র।
৫. চাওয়া পাওয়া (১৯৫৯) – হালকা মেজাজের রোম্যান্টিক ক্লাসিক।
৬. ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১) – দ্বৈত চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়।
৭. অগ্নীশ্বর (১৯৭৫) – একজন আদর্শবাদী চিকিৎসকের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়।
৮. অমানুষ (১৯৭৫) – বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষাতেই তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়।
৯. চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) – ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয়।
১০. অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭) – জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অসাধারণ অভিনয়।
উত্তম কুমারের উত্তরাধিকার
উত্তম কুমার প্রমাণ করেছিলেন, একজন নায়ক শুধু সুদর্শন হলেই হয় না; তাঁকে হতে হয় একজন দক্ষ অভিনেতা, একজন মার্জিত মানুষ এবং দর্শকের হৃদয়ের আপনজন। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও পরিশীলিত রুচি বাংলা চলচ্চিত্রকে এক নতুন মর্যাদা দিয়েছে। আজকের বহু অভিনেতাও তাঁর অভিনয়শৈলী, সংলাপ বলার ধরন এবং চরিত্র নির্মাণ থেকে অনুপ্রেরণা নেন। সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু উত্তম কুমারের আবেদন বদলায়নি।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
"মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিংবদন্তিরা থেকে যান তাঁদের সৃষ্টির মধ্যেই। মহানায়ক উত্তম কুমার সেই বিরল কিংবদন্তিদের একজন। ২৪ জুলাই তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। যতদিন বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলা সিনেমা থাকবে, ততদিন মহানায়ক উত্তম কুমার বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙালির হৃদয়ে।"
উত্তম কুমারের প্রথম ও শেষ সিনেমা এবং তাঁর প্রয়াণ দিবস কীভাবে পালন করে পরিবার
বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার (৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ – ২৪ জুলাই ১৯৮০) আজও বাঙালির হৃদয়ে এক অমর নাম। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, রোমান্টিক ভাবমূর্তি এবং পর্দার উপস্থিতি তাঁকে শুধু একজন অভিনেতা নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির এক প্রতীক করে তুলেছে।
উত্তম কুমারের প্রথম সিনেমা
উত্তম কুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল “দৃষ্টিদান”(১৯৪৮)। এই ছবিতে তিনি অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে অভিনয় করেন। শুরুতে তাঁর চলচ্চিত্র জীবন খুব সহজ ছিল না। একের পর এক ছবি ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর প্রতিভা ও অধ্যবসায় তাঁকে ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার শীর্ষে নিয়ে যায়।
উত্তম কুমারের শেষ সিনেমা
উত্তম কুমারের শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ছিল “ওগো বধূ সুন্দরী”(১৯৮১)। এই ছবির শুটিং চলাকালীনই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর ছবিটি মুক্তি পায় এবং দর্শকদের কাছে এটি মহানায়কের শেষ স্মৃতি হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবস পালন
প্রতি বছর ২৪ জুলাই, উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবসে তাঁর পরিবার, অনুরাগী ও বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করে।
আজও “সপ্তপদী”, “হারানো সুর”, “সাগরিকা”, “নায়ক”, “অগ্নীশ্বর”, “ঝিন্দের বন্দী”–এর মতো অসংখ্য ছবি তাঁকে বাঙালির মনে চিরকাল বাঁচিয়ে রেখেছে। মহানায়কের প্রয়াণের বহু বছর পরেও তিনি বাংলা সিনেমার চিরন্তন মহানায়ক।
- More Stories On :
- Uttam Kumar
- Mahanayak
- Tollywood,

